চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন ট্যারিফ নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীরা মুখোমুখি অবস্থানে। সরকার বলছে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই মাশুল বাড়ানো হয়েছে প্রায় চার দশক পর, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যুক্তিসংগত। অন্যদিকে বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা এটি অযৌক্তিক, অগ্রহণযোগ্য এবং তা অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দেয়ার মতো কঠোর কর্মসূচির কথাও ভাবছেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দরে ৫২টি মূল সেবার বিপরীতে মাশুল আদায় করা হতো। নতুন কাঠামোতে তা কমিয়ে ২৩টিতে আনা হয়েছে। এছাড়া বিলুপ্ত হয়েছে চারটি পুরনো সেবা, আর যুক্ত হয়েছে পাঁচটি নতুন সেবা। নতুন ট্যারিফে সেবা খাতে গড়ে ৪০ থেকে ৪১ শতাংশ পর্যন্ত মাশুল বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে ১৪ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ হয়, যা কার্যকর হয় ১৫ অক্টোবর থেকে। বিদেশী অপারেটরদের সুবিধা দিতেই নতুন মাশুল কার্যকর করা হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
নৌ-পরিবহন সচিব মোহাম্মদ ইউসুফও সম্প্রতি বলেছেন, ‘গত প্রায় ৪০ বছর বন্দরের মাশুল বাড়ানো হয়নি। সমীক্ষা ও বাস্তব খরচ বিশ্লেষণ করেই নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ হার আরো আগে, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর বাড়ানো উচিত ছিল। এখন যেহেতু আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে তাদেরও ব্যবসায়িক মুনাফার বিষয় রয়েছে। তাই মাশুল কমানোর সুযোগ নেই।’
বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা যদিও এটাকে যুক্তি হিসেবে মানতে রাজি নন। চট্টগ্রাম নগরের নেভি কনভেনশন হলে গতকাল আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভা থেকে তারা সরকারকে এক সপ্তাহের আলটিমেটাম দেন। নতুন মাশুল স্থগিত না করলে চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ করে দেয়ার মতো বড় কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন ব্যবসায়ীরা।
পোর্ট ইউজার্স ফোরামের আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এ বর্ধিত মাশুল স্থগিত করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত ট্যারিফ নির্ধারণ করতে হবে। আগামীকাল (আজ) থেকে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করবে। এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধান না হলে আমরা বন্দর কার্যক্রম স্থগিতের মতো বৃহত্তর কর্মসূচি দেব।’
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘কোনো কোনো খাতে ট্যারিফ ৭০০ শতাংশ পর্যন্তও বাড়ানো হয়েছে, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমদানিকারক পণ্য এনেছে, কিন্তু কাস্টমসের অ্যাসেসমেন্টে দেরি হলে বা অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যার কাজ না করলে ব্যবসায়ী কেন পেনাল্টি দেবে? এখনই এ সিদ্ধান্ত স্থগিত না করলে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। তাছাড়া এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে নেয়া হয়েছে যখন এফবিসিসিআই, চট্টগ্রাম চেম্বারসহ বড় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বহীন অবস্থায় আছে।’
মাশুল বাড়িয়ে বিদেশী অপারেটর নিয়োগ দেয়া যাবে না—এমন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা বিদেশী অপারেটরের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু মাশুল বাড়িয়ে বিদেশী অপারেটর নিয়োগ দেয়া যাবে না। বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেই যৌক্তিক হারে মাশুল নির্ধারণ করতে হবে। নতুবা আগামীতে বন্দর বন্ধ হয়ে গেলে যারা এটা করেছেন তারাই এর জন্য দায়ী হবেন, আমরা নই।’
লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দরকে আরো ব্যয়বহুল করে তোলা অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে মনে করেন এশিয়ান-ডাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুস সালাম। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর লাভে থাকলেও এখানেই মাশুল বাড়ানো হয়েছে কিন্তু মোংলা ও পায়রায় নয়। এটা নিঃসন্দেহে এক ধরনের কারসাজি।’
সভায় সভাপতিত্ব করেন ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি এসএম আবু তৈয়ব। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘যে সরকার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ট্যারিফ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, সে সরকারই আবার দেশে এসে বন্দরের ট্যারিফ বাড়ায়। এটা এক প্রকার দ্বিমুখিতা। দেশের ব্যবসায়ীরা আজ উদ্বিগ্ন। কেননা নতুন ট্যারিফ তাদের সরাসরি ক্ষতির মুখে ফেলবে।’
প্রতিবাদ সভায় বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠনের দুই হাজারের বেশি ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিলেন। হাত তুলে তারা বর্ধিত মাশুল স্থগিতের দাবি জানান।
চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএম সাইফুল আলম বলেন, ‘যদি নতুন ট্যারিফ প্রত্যাহার না হয়, তাহলে অনেক সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান টিকতে পারবে না। প্রায় হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।’
আলোচনায় অংশ নিয়ে বন্দর ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির সোহেল বলেন, ‘আমাদের ১২ হাজার গাড়ি আছে বন্দরে। একবার যাত্রায় আয় হয় মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ প্রবেশ ফি একলাফে ৫৭ থেকে ২৩০ টাকা করা হয়েছে, এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এভাবে খরচ বাড়লে পরিবহন ব্যবসা টিকবে না।’
এদিকে প্রাইম মুভার ও ফ্ল্যাটবেড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, তাদের ১৫ হাজার গাড়ি, ১০ হাজার শ্রমিক। বন্দরে কোনো টার্মিনাল, ক্যান্টিন বা চালকের জন্য ওয়াশরুম নেই। অথচ তিন জায়গায় ট্যাক্স দিতে হয়। এখন আবার চার গুণ ফি বাড়ানো হয়েছে।
গাড়ি প্রবেশের মাশুল চার গুণ করার প্রতিবাদে তাই প্রাইম মুভার মালিকরা অঘোষিত কর্মবিরতি পালন করছেন। নগরের সল্টগোলা ক্রসিংয়ে অবস্থান নিয়ে গতকাল তারা বন্দরমুখী ট্রেইলার আটকান। মাইক হাতে শ্রমিকরা ঘোষণা দেন—‘বর্ধিত মাশুল দেব না।’
জানতে চাইলে প্রাইম মুভার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্ধিত মাশুল শ্রমিক না মালিক কে দেবে, তা পরিষ্কার করা হয়নি। শ্রমিকরা বলছে তারা অতিরিক্ত টাকা দেবে না। তাই ট্রেইলার চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন ট্যারিফ মূলত ৪০ বছর পর বাস্তবসম্মত পুনর্বিন্যাস। কেননা বন্দরের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য ছিল না। জাহাজ ভাড়া, জ্বালানি, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহু গুণ বেড়েছে। অথচ ট্যারিফ অপরিবর্তিত ছিল। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বন্দরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এখনো চট্টগ্রামের ট্যারিফ সর্বনিম্ন। তাই ট্যারিফ পুনর্গঠনের জন্য ২০২০ সালে সরকার স্পেনের খ্যাতনামা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইডমকে নিয়োগ দেয়। ওই সংস্থার প্রস্তাব ও স্টেকহোল্ডার আলোচনার ভিত্তিতেই গেজেট প্রকাশ করা হয় বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, প্রতি কনটেইনারে গড়ে ট্যারিফ বৃদ্ধি হয়েছে ৩ হাজার ৮০০ টাকা, যা পণ্যের মূল্যে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ১২ পয়সা যোগ করবে। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্যে ১৫ পয়সা বাড়বে, যা ভোক্তার জীবনমানের ওপর কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে না। তারা আরো জানায়, রফতানি পণ্যের ওপর এর প্রভাব পড়বে না। কারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বেশির ভাগ পণ্য এফওবি (ফ্রেইট অন বোর্ড) পদ্ধতিতে রফতানি হয়, যার পরিবহন ব্যয় বহন করে বিদেশী আমদানিকারকরা।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর সচিব ওমর ফারুক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘১৯৮৬ সালের পর এবারই প্রথম পূর্ণাঙ্গ ট্যারিফ হালনাগাদ করা হয়েছে। সময়ের বাস্তবতায় পুরনো কাঠামো টেকসই ছিল না। বন্দর নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ সব ধরনের ব্যয়ই বেড়েছে। এখনকার আয়ও বন্দরের উন্নয়ন ও সেবার মানোন্নয়নেই ব্যয় করা হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকার সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেই যৌক্তিক কাঠামো তৈরি করেছে। বন্দর ব্যবহারকারীরাই এ উন্নয়নের সরাসরি উপকারভোগী হবেন।’